তালেবানের জন্ম: কোয়েটার গর্ভে নাকি কান্দাহারের মাটিতে?

পতিত ক্ষমতাসীনদের একটি অবান্তর প্রশ্নের জবাব। সত্যিই কি পাকিস্তানের কোয়েটা নগরীতে জন্ম নিয়েছিল তালেবান আন্দোলন?

সমকালীন আফগানিস্তানের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যেসব দলের আনাগোনা, তাদের সিংহভাগের আঁতুড়ঘর কিন্তু এই যুদ্ধবিধ্বস্ত জন্মভূমির বাইরে। বিগত রুশবিরোধী জিহা|দের অগ্নিগর্ভ দিনে সাতটি রাজনৈতিক শিবিরের গোড়াপত্তন হয়েছিল পাকিস্তানের মাটিতে, আর আটটি দানা বেঁধেছিল ইরানের আশ্রয়ে। ইতিহাসের এই পটভূমিকে ঢাল বানিয়ে অনেকে তা|লেবানকেও একই দাঁড়িপাল্লায় মাপতে চান। তাঁদের দাবি— তা|লেবান আন্দোলনের বীজও রোপিত হয়েছিল পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের হৃৎপিণ্ড তথা 'কোয়েটা শুরা' বা কোয়েটা কাউন্সিলের ছায়াতলে।

তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতা এই সরলীকরণকে সমর্থন করে না। যে ‘ তালেবান আন্দোলন’ কালক্রমে ‘ইমারতে ইসলামিয়া’-এর মহীরুহে পরিণত হয়েছিল, তার প্রকৃত জন্মলগ্নের সাক্ষী আফগানিস্তানেরই প্রাচীন রাজধানী কান্দাহার। এই মাটির বুকেই তার অঙ্কুরোদগম, এখানেই তার বিকাশ এবং এখান থেকেই তা ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়েছিল আফগানিস্তানের দিক-দিগন্তে। এ বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতে বিবৃত হলেও, ওপরের ওই কৃত্রিম দাবিটিকে যুক্তির কষাঘাতে খণ্ডন করতে নিম্নে কয়েকটি অকাট্য সত্য পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন:

প্রথমত, ইমারতে ইসলামিয়ার স্থপতি মো|ল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজা|হিদ কখনো পাকিস্তানে বসবাস করেননি। যখন রুশ আগ্রাসনের রক্তচক্ষুতে লাখো মানুষ ঘর ছাড়ছিল, তখনো তাঁর পরিবার দেশান্তরী হয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়নি; বরং সমস্ত ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তাঁরা উরুজগান প্রদেশের বুকেই মাটি কামড়ে থেকে গিয়েছিলেন। সোভিয়েত-বিরোধী জিহা|দের উত্তাল দিনগুলোতে অন্যান্য মুজা|হিদের মতো হয়তো চিকিৎসার প্রয়োজনে অতি অল্প কিছুদিনের জন্য তিনি পাকিস্তানে পা রেখেছিলেন, তবে তা ছিল দিনপঞ্জিকার হিসেবে যৎসামান্য সময় মাত্র। আন্দোলনের সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে মৃত্যুর অমোঘ মুহূর্ত পর্যন্ত, তিনি একটি ঘণ্টার জন্যও আফগানিস্তানের সীমানা পেরিয়ে পরবাসে যাননি। অতএব, পাকিস্তানের জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সাথে যার বিন্দুমাত্র চাক্ষুষ পরিচয় ছিল না, তিনি সেই পরভূমে বসে রাজনৈতিক ঘুঁটি চালবেন এবং একটি বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক আন্দোলনের ইমারত খাড়া করবেন—এমন ভাবনা কেবল অবান্তরই নয়, অসম্ভবও বটে।

মূলত, এটি ছিল প্রতিপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ—এক শত্রুতামূলক অপপ্রচার ও অলীক ধারণা, যা বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকালে এর অন্তরালের ধ্রুব সত্যটি আজ আর কারও অজানা নয়।

দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলনের জন্ম যদি পাকিস্তানের গর্ভেই হতো, তবে তার চালিকাশক্তিতে পাকিস্তানের প্রভাবের ছাপ থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু ইতিহাসে এমন একটি নজিরও কেউ দেখাতে পারবে না, যেখানে মো|ল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজা|হিদ পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইমারতে ইসলামিয়ার যেকোনো নীতি নির্ধারণের একমাত্র পরম মাপকাঠি ছিল—মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দ্বীনের সার্বিক কল্যাণসাধন।

সার্বভৌমত্বের অনমনীয় দলিল

ইমারতে ইসলামিয়া বাইরের কোনো শক্তির পুতুল ছিল না, তার সবচেয়ে বড় ও জ্বলজ্বলে প্রমাণ মেলে ওসা|মা বিন লা|দেনের অধ্যায়ে। বিশ্বের অন্যান্য পরাক্রমশালী দেশের নেতাদের মতো তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরাও জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন, যাতে ইমারতে ইসলামিয়া ওসা|মা বিন লা|দেনকে হস্তান্তর করে কিংবা তাঁর বিষয়ে কোনো আপস বা চুক্তিতে উপনীত হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে তারা কান্দাহারের দরবারে উচ্চপর্যায়ের এক প্রভাবশালী প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও মো|ল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজা|হিদ তাদের কোনো প্রলোভন, পরমর্শ বা হুকুমের কাছে মাথা নত করেননি। সমস্ত বৈশ্বিক চাপকে একপাশে ঠেলে দিয়ে তিনি কেবল সেই পথই বেছে নিয়েছিলেন, যা তাঁর অন্তরের অবিচল ঈমান এবং খাঁটি বিবেককে তৃপ্ত করেছিল।ত

খিলাফতথেকে ইমারা

ওমরথেকে ওমর

No comments:

Post a Comment